বর্ষা আর বন্যায় পাহাড় থেকে সমতল-সবখানেই বাড়ে বিষধর সাপের আনাগোনা। বৃষ্টির কারণে লোকালয়ে ছুটে আসে বিষধর সাপ। যার ভুক্তভোগী হচ্ছেন তৃণমূলের মানুষ। দেশে প্রতি বছরই বাড়ছে সাপের কামড়ে মৃত্যুর সংখ্যা। নেই বিষাক্ত সব সাপের অ্যান্টিভেনম (সাপের বিষের প্রতিষেধক)। প্রান্তিক পর্যায় (ইউনিয়ন) পর্যন্ত থাকে না অ্যান্টিভেনম, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও থাকে সংকট। এছাড়া নানা কুসংস্কার তো রয়েছেই। যার ফলে দেশে সাপের কামড়ে মৃত্যু বাড়ছে। এমন অবস্থায় দেশেই অ্যান্টিভেনম তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদীখানের কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে এসেনসিয়াল ড্রাগসের (ইডিসিএল) মাধ্যমে অ্যান্টিভেনম তৈরি করা হবে। ইতোমধ্যে কাজ শুরুর উদ্যোগ নিয়েছে মন্ত্রণালয়।
এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশে প্রতি বছর প্রায় সাত লাখ মানুষ সাপের আক্রমণের শিকার হন। তাতে বছরে সাড়ে সাত হাজারের বেশি মানুষের সাপের কামড়ে মৃত্যু হয়। কয়েক বছর ধরে রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়ার আক্রমণ নিয়ে বেশি আলোচনা হলেও বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যান গোখরা ও কালকেউটের কামড়ে। আর সবচেয়ে বেশি মানুষ সাপের আক্রমণের শিকার হন মে, জুন ও জুলাই মাসে। মূলত বর্ষায় দেশের উপকূলীয় এলাকার মানুষ এবং বন্যার সময় উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন বেশি। তবে বাংলাদেশে প্রতি বছর বর্ষায় চন্দ্রবোড়া, গোখরা, কালকেউটে, কিং কোবরা ও সবুজ বোড়ার মতো সাপের কামড়ের ঘটনা বাড়ে। এখন উপজেলা পর্যায়ে ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনম ভারতের সাপের বিষ থেকে তৈরি, যা সব সময় কার্যকর হয় না। চিকিৎসকের বদলে কবিরাজ বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভরতার কারণে মৃত্যু ঘটে। জরিপ অনুযায়ী, ৮৬ শতাংশ রোগী অপচিকিৎসার শিকার হন, মাত্র ৩ শতাংশ মানুষ হাসপাতালে যান।
বাংলাদেশে ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনমগুলো শত বছরের পুরোনো প্রযুক্তিতে তৈরি এবং দক্ষিণ ভারতের চার ধরনের সাপ থেকে সংগৃহীত বিষে তৈরি হওয়ায় সব ধরনের সাপের বিষের বিরুদ্ধে এটি কার্যকর নয়। অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের পরও ২০ থেকে ২২ শতাংশ রোগীর মৃত্যু হয়। অন্তত সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টার সমন্বিত চিকিৎসাসেবা চালু করা গেলে মৃত্যুর হার কমানো সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৮ সালের মে মাসে সাপে কাটাকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে ঘোষণা করে এবং প্রতিষেধক তৈরির উদ্যোগ নিতে সদস্য দেশগুলোকে আহ্বান জানায়। এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশে এই গবেষণা শুরু হয়।
২০২৩ সালের জাতীয় সর্পদংশন জরিপ বলছে, প্রতি লাখে ২৪৪ জন সাপের কামড়ের শিকার হন। মৃত্যুর হার লাখে ৪৫ জন। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের ৯৫ শতাংশ গ্রামীণ এলাকা থেকে এবং পুরুষরা নারীদের তুলনায় চারগুণ বেশি আক্রান্ত হন। খুলনা ও বরিশাল বিভাগে দংশনের হার বেশি। দেশে ৮০টির বেশি সাপের প্রজাতি রয়েছে, এর মধ্যে ৩৩টি বিষধর। এছাড়া অনেক প্রজাতি রয়েছে এখনো অজানা। আর ৩৩টি প্রজাতির বিষধর সাপ থাকলেও ভারত থেকে আনা অ্যান্টিভেনম কেবল গোখরা, শঙ্খিনী ও চন্দ্রবোড়া সাপের বিষের বিরুদ্ধে কাজ করে। অন্য সাপের ক্ষেত্রে এই অ্যান্টিভেনম ভালো কাজ করে না। ফলে অনেক সময় রোগীর মৃত্যু হয়। দেশীয় ব্যবস্থাপনায় প্রতিষেধক উৎপাদন এবং সাপ নিয়ে গবেষণা করে পরবর্তী অ্যান্টিভেনম তৈরি করতে পারলে মৃত্যুর সংখ্যা কমানো সম্ভব। যার কারণে সাপ নিয়ে আরো বৃহত্তর পরিসরে গবেষণা করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, বাংলাদেশে কোন কোন সাপ রয়েছে, সেটার ওপরে একটা গবেষণা হওয়া উচিত। এরপর দেশে কোন কোন অ্যান্টিভেনম লাগবে, সেটা আমদানি বা পরবর্তী সময়ে উৎপাদন করতে হবে। আর জীবন বাঁচাতে কিছু অ্যান্টিভেনম আছে, সব সাপের বেলায় প্রযোজ্য এবং দেওয়া যাবে; সেগুলো পাওয়া যায়। বিদেশ থেকে আমদানিকৃত অ্যান্টিভেনমের দাম বেশি বলে মনে করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম। তিনি বলেন, আমদানি করা একটি অ্যান্টিভেনমের দাম ১২ হাজার টাকা। মূল্য বেশি হওয়ায় উপজেলা হাসপাতালগুলোতে চার-পাঁচটির বেশি সরবরাহ করা যায় না। আমরা যদি নিজস্ব উৎপাদনে যেতে পারি, তাহলে সুরক্ষা বাড়বে এবং খরচও অনেক কমে যাবে। এই লক্ষ্যেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কাজ করছে। তিনি বলেন, দেশে অ্যান্টিভেনম উৎপাদন হয় না। কিন্তু আমাদের দেশে সাপের সংখ্যা অনেক। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের সাপের মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে, তাই অনেক সময় আমদানিকৃত এন্টিভেনম ব্যবহার করেও রোগীকে বাঁচানো যায় না। আমরা যদি নিজেরা অ্যান্টিভেনম উৎপাদন করতে পারি, তবে সেটি ব্যয়সাপেক্ষ হলেও ভর্তুকি দিয়ে মানুষকে উপকৃত করা যাবে। পাশাপাশি কীভাবে এটি খরচ-সাশ্রয়ী করা যায়, তা নিয়েও ভাবা হচ্ছে। নুরজাহান বেগম বলেন, কোথাও সাপের কামড়ের রোগী বেড়ে গেলে সংকট তৈরি হয়। অ্যান্টিভেনমের অভাবে অনেক সময় রোগী মারা যান, আবার অ্যান্টিভেনম দেওয়ার পরেও সাপের প্রজাতি ভিন্ন হওয়ার কারণে রোগী মারা যান। আমরা যদি নিজেরা উৎপাদন শুরু করি, তবে আমাদের সক্ষমতা বাড়বে। আমদানি করা একটি অ্যান্টিভেনমের দাম ১২ হাজার টাকা। মূল্য বেশি হওয়ায় উপজেলা হাসপাতালগুলোতে চার-পাঁচটির বেশি সরবরাহ করা যায় না। আমরা যদি নিজস্ব উৎপাদনে যেতে পারি, তাহলে সুরক্ষা বাড়বে এবং খরচও অনেক কমে যাবে। এই লক্ষ্যেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কাজ করছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী, স্থানীয় সাপ থেকে তৈরি অ্যান্টিভেনমই সবচেয়ে কার্যকর। কারণ একেক দেশের সাপের প্রকৃতি একেক রকম। ভারতে যেসব সাপের বিষ থেকে অ্যান্টিভেনম তৈরি হয়, সেগুলোর মাত্র ২০ শতাংশ বাংলাদেশের সাপের সঙ্গে মেলে। তবু বছরের পর বছর ধরে ওই অ্যান্টিভেনমই বাংলাদেশে ব্যবহার হচ্ছে। সামুদ্রিক সাপ, পিট ভাইপার ও দুর্লভ ক্রেইট প্রজাতির সাপের বিষের ক্ষেত্রে ভারতের অ্যান্টিভেনম অকেজো। অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, দেশে সাপের অ্যান্টিভেনম তৈরি করা হবে, এটি খুবই ভালো উদ্যোগ। দেশে সাপে কামড়ে মানুষের মৃত্যু কমে আসছে। আমাদের দেশে সব সাপের প্রতিষেধক নেই। এছাড়া নানা কুসংস্কার রয়েছে। তিনি বলেন, অ্যান্টিভেনম তৈরি করার জন্য যে কারখানা স্থাপন করা হবে, সেটিকে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার এবং আরও আধুনিক যন্ত্রপাতি এলে সেটির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কিছু অঞ্চল রয়েছে, যেসব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিনিয়ত সাপে কাটা রোগী আসে এবং এটি সারা দেশব্যাপী বিস্তৃত। আর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভেনম থাকবে না, এটি কল্পনা করা যায় না। বিদেশ থেকে অ্যান্টিভেনম আনা এবং প্রয়োজনীয় অনুযায়ী সরবরাহ ও সংক্ষরণ করা খুবই কঠিন। ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, আমরা সুনির্দিষ্টভাবে সাপটাকে নির্ণয় করতে পারি না। কারণ সাপ কামড় দিয়ে চলে গেছে। শুধু কামড়ের চিহ্নটা থাকে। আর সবসময় চিহ্ন দেখে নির্ণয় করা যায় না। দেশে কারখানা হলে সাপ নিয়ে গবেষণা বাড়বে। যেসব এলাকায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, সেসব এলাকায় পর্যাপ্ত সরবরাহ করা যাবে। ভারত থেকে আমদানি করা সাপের বিষের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. ফয়েজ বলেন, বাংলাদেশে ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনমগুলো শত বছরের পুরোনো প্রযুক্তিতে তৈরি এবং দক্ষিণ ভারতের চার ধরনের সাপ থেকে সংগৃহীত বিষে তৈরি হওয়ায় সব ধরনের সাপের বিষের বিরুদ্ধে এটি কার্যকর নয়। অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের পরও ২০ থেকে ২২ শতাংশ রোগীর মৃত্যু হয়। অন্তত সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টার সমন্বিত চিকিৎসাসেবা চালু করা গেলে মৃত্যুর হার কমানো সম্ভব।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

* উৎপাদন শুরু হলে কমবে মৃত্যু * জীবন বাঁচাতে সাপ নিয়ে গবেষণার তাগিদ * বেশি আক্রান্ত বরিশাল ও খুলনা বিভাগে * আক্রান্তদের ৯৫ শতাংশ গ্রামীণ এলাকার
সাপের কামড়ে মৃত্যু বাড়ছে, প্রতিষেধক তৈরির উদ্যোগ
- আপলোড সময় : ৩০-০৮-২০২৫ ১২:০৭:৩৬ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ৩০-০৮-২০২৫ ১২:০৭:৩৬ পূর্বাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ